নির্বাচন ব্যবস্থার ঢেলে সাজানো সংস্কার এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার রাজধানীর যন্তরমন্তরে আবারও বড়সড় আন্দোলনের ডাক দিয়েছে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদনের প্রক্রিয়া শেষ করতে না পারার অজুহাতে এই বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। তা সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থানে অনড় সিজেপি নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, অনুমতি না মিললেও শনিবারের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ১০ অক্টোবর যথারীতি চলবে; দরকারে পুরো দিল্লিকেই ‘যন্তরমন্তর’-এ পরিণত করা হবে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে রাজধানীজুড়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন উত্তেজনা।
উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ে যন্তরমন্তরে সিজেপির প্রথম দফার আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছিল দিল্লি পুলিশকে। সে সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্যালেট গান ব্যবহারের অভিযোগ উঠলে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। জুলাইয়ের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবং দ্বিতীয় দফার ‘যন্তরমন্তর-২’ বিক্ষোভ প্রতিরোধে এবার কোনো ফাঁক রাখতে চাইছে না পুলিশ ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীনে থাকা দিল্লি পুলিশের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর কড়া নজর রাখছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি নিজের একাধিক রাজ্য সফরের নির্ধারিত সূচি বাতিল করে দিল্লিতেই অবস্থান করছেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে একযোগে প্রায় ২৩ হাজার আধাসামরিক সদস্য (২৩১ কোম্পানি) রাজধানীতে উড়িয়ে আনা হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানাচ্ছে, এই বাহিনীতে রয়েছে সিআরপিএফ, আইটিবিপি, এসএসবি এবং সিআইএসএফ-এর জওয়ানরা। জি-২০ সম্মেলনের পর রাজধানী দিল্লিতে এত বিপুল সংখ্যক আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের নজির আর দেখা যায়নি। মূলত মধ্য দিল্লির আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোর সুরক্ষায় তাদের ব্যবহার করা হবে। এর পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় থাকবে দিল্লি পুলিশের প্রায় ১৫ হাজার সদস্য।
সারা দেশ থেকে লাখ লাখ তরুণ ও সাধারণ মানুষের এই সমাবেশে অংশ নেওয়ার আশঙ্কা করছে প্রশাসন। জনস্রোত আটকাতে মধ্য দিল্লির সংযোগকারী রুটের প্রায় ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। সিজেপির আগের বিক্ষোভের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে হাজার হাজার আন্দোলনকারীর ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। শহরের দিকে আসা বাসগুলোতে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও পেয়িং গেস্ট (পিজি) হোস্টেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভে যোগ দিতে নিষেধ করা হচ্ছে।
তবে পুলিশের এই ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন সিজেপির সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস। সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কোন অধিকারে পুলিশ নাগরিকদের কোনো বিক্ষোভে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার আহ্বান জানায়?’ আন্দোলন ও প্রতিবাদ জানানোকে সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার উল্লেখ করে তিনি জানান, তাদের আন্দোলন হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। হয় কর্তৃপক্ষ যন্তরমন্তরে জায়গা করে দেবে, না হলে গোটা দিল্লিকেই অবরুদ্ধ হতে দেখা যাবে।
এদিকে, আম আদমি পার্টির (আপ) দিল্লি রাজ্য সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ অভিযোগ তুলেছেন, ‘আপ’ এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ‘এএসএপি’-র বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবককে পুলিশ তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখেছে এবং তাঁদের মোবাইল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা যদি বিশাল সংখ্যায় জড়ো হন এবং সরে না গিয়ে গণগ্রেপ্তার বরণ করেন, তবে তাঁদের রাখার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন স্টেডিয়ামকে অস্থায়ী আটক কেন্দ্র বা জেল হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনাসহ নানা বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে পুলিশ।
গত ২ অক্টোবর থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির পাশাপাশি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা), একাধিক বামপন্থী দল এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো দেশজুড়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। পাশাপাশি কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলের সাংসদরাও রাজধানীতে প্রতিবাদ বজায় রেখেছেন, যা শনিবারের এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক উত্তাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।