দাবি আদায়ের ‘চূড়ান্ত লড়াইয়ে’ নেমেছেন কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শসেনইমেকহা) ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও বেতন বৈষম্য দূরীকরণসহ ৬ দফা দাবিতে আজ রোববার (৭ জুন) থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন তাঁরা। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মেডিকেল কলেজে ‘একাডেমিক শাটডাউন’ কর্মসূচি দেওয়ায় পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম।

​আকস্মিক এই ধর্মঘটের কারণে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত সাধারণ ও অসহায় রোগীর ওপর।

​রোববার (৭ জুন) ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) সভাপতি ডা. মো. আবু ইউসুফ ও সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আদনান কবির স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে ৬ দফা দাবিতে গত ৪ জুন ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

​আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের অভিযোগ, সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক নোটিশে চিকিৎসকদের ওপর অত্যন্ত বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক প্রস্তাব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ইন্টার্ন ও ট্রেইনি ডাক্তারদের অপ্রতুল বেতন বৃদ্ধি, এফসিপিএস কোর্সের চিকিৎসকদের বেতন বৈষম্য দূর করা, ভর্তি পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি প্রত্যাহার এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবিতে আবেদন জানিয়ে আসছিলেন।

​ক্ষোভ প্রকাশ করে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বলেন, ​বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও প্রশাসন কেবল আমাদের আশ্বাসই দিয়েছে, দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণেই আমরা এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।

চিকিৎসকদের ঘোষিত ৬টি মূল দাবি হলো, এফসিপিএস পার্ট-১ উত্তীর্ণ বেসরকারি প্রশিক্ষণার্থীদের পদায়ন সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা বাতিল করা। বিএমইউ ও বিসিপিএস-এর ভর্তি পরীক্ষার ফি কমিয়ে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা করা। ইন্টার্নদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা ও ট্রেইনি চিকিৎসকদের বেতন ৯ম গ্রেডের সমপর্যায়ে করা। চিকিৎসকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে বিশেষ আইন পাস করা। বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৪ বছর করা। শ্রম আইন অনুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট জাতীয় বেতন কাঠামো তৈরি।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা তাড়াইল উপজেলার ষাটোর্ধ্ব রহিমা বেগমের স্বজন মো. আলমগীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সকাল ১০টায় রোগীরে নিয়া আইছি। এহন দুপুর পার হইয়া গেল, ডাক্তার দেহাইতে পারি নাই। হুনতাছি ডাক্তাররা নাকি ধর্মঘট করতাছে। আমাগো মতো গরিব মাইনষের জীবন নিয়া এইড্যা কেমন খেলা?

শিশু ওয়ার্ডে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে আসা বাবা রিয়াজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডাক্তারদের দাবি-দাওয়া থাকতেই পারে, কিন্তু আমাগো নিষ্পাপ বাচ্চাগো জিম্মি কইরা কেন? নার্সরা ওষুধ দিতাছে ঠিকই, কিন্তু বাচ্চার শ্বাসকষ্ট বাড়লে যে ডাক্তার দেখব, সেই ডাক্তারই তো নাই। হাসপাতাল যেন এহন এক মরণফাঁদ!

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুস্তাকিন দিপু বলেন, সারাদেশের ডাক্তার সমাজ ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ৬ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত ইন্টার্ন ডাক্তারদের কর্মবিরতির সাথে সংহতি প্রকাশ করে সকল প্রকার একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করছি সাধারণ শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে।

এ বিষয়ে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইন্টার্ন ডক্টরস এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা: মো: আবু ইউসুফ বলেন, ” চলমান আন্দোলনের ৬ দফা দাবি পূরণ হওয়ার আগ অব্দি ইন্টার্ন কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। ডাক্তারদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও যৌক্তিক দাবি আদায়ে সকল অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়া এখন সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ”

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক চিকিৎসক নাসিরুজ্জামান বলেন, আমাদের হাসপাতাল অন্যান্য মেডিকেল কলেজের তুলনায় বেশ ছোট। যার কারণে আমাদের এখানে মিড-লেভেল বা মেডিকেল অফিসার পর্যায়ের ডাক্তারের সংখ্যা খুবই কম। হাসপাতালের বহির্বিভাগেও কিছু ইন্টার্ন দায়িত্ব পালন করেন, তবে তাদের মূল পদচারণা এবং কাজের চাপ থাকে অন্তর্বিভাগে (ইনডোরে)। মিড-লেভেল ডাক্তারের সংকটের কারণে এই কর্মবিরতিতে আমরা সমস্যায় পড়েছি।

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ চিকিৎসক একরাম আহসান জুয়েল বলেন, অধ্যক্ষ স্যার ছুটিতে আছেন। উনি আজ রাতে আসবেন। অধ্যক্ষ স্যারের সাথে কথা বলে বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।