দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশই আসে কিশোরগঞ্জ জেলা থেকে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার এক বড় ভরসার নাম এই জেলার হাওরাঞ্চল। কিন্তু সেই বড় অংশ জুড়েই এখন অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। টানা পাঁচ দিনের ভারি বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ফসলি জমি এখন পানির নিচে। কৃষকরা বলছেন ২০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
তবে কৃষি বিভাগ বলছে, প্রায় ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইটনায় ২৬৫০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর আগে হাওর অঞ্চলে শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় মোট ২৪৬১ হেক্টর জমির বোরো ধান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবারের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে মোট ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ হয়নি। যদি পানি নেমে তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওর অঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর আবাদ করা হয়েছে। হোসেনপুর ও পাকুন্দিয়া ছাড়া ১১ উপজেলাকেই হাওরভুক্ত উপজেলা ধরা হয়। হাওর অঞ্চলের আবাদের ৫৪% অর্থাৎ ৫৫ হাজার ১৪৫ হেক্টর কর্তন হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ ধান মাঠেই রয়ে গেছে।
হাওর ঘুরে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোদ থাকায় কৃষকেরা কর্তন থেকেও কর্তনকৃত ধান মাড়াই ও শুকানো নিয়ে ব্যস্ত। এছাড়া মাড়াইকৃত স্তুপ করা ধান থেকে ইতিমধ্যে চারা গজিয়েছে দেখা গেছে। কৃষকেরা বলছেন, মাড়াই করা কাঁচা ধান দ্রুত সময়ের মধ্যে শুকানো সম্ভব না হলে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিলো।
এদিকে অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন, নিকলী, তাড়াইল ও বাজিতপুরের কৃষকেরা জানিয়েছেন ধান কাটার জন্য ১৫০০ থেকে ১৭০০ টাকায় শ্রমিক মিলছে। অঅস্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নের কৃষক তাজুল ইসলাম (৪৫) বলেন, পানির জন্য হার্ভেস্টারে ধান কাটে না। ধাওয়ালও (কৃষি শ্রমিক) পাওয়া যায় না। আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে ক’জন ধাওয়াল নিয়ে হাওরে গিয়ে ফিরে এসেছি, কারণ ডুবন্ত জমি সনাক্ত করা যাচ্ছে না। হাওরে পানি আর পানি এবারের ক্ষতি কোন ভাবেই পোষানো যাবে না। তিন দিন আগেও এক কানি (৭৫ শতাংশ) জমির ধান কাটতো পাঁচ হাজারে, এখন ৮হাজার টাকা দিয়েও ধাওয়াল পাওয়া যাচ্ছে না।
নিকলী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক জানান, বিগত ২৪ ঘন্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আবহাওয়া এখন ভালোর দিকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, অতিবৃষ্টিতে হাওরের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। তবে ইটনায় ১৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। চামড়াঘাটে ২ সেন্টিমিটার পানি হ্রাস পেয়েছে। অষ্টগ্রামের কালনীতে ১ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। ভৈরব বাজারে ৩ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, আগামী দুই তিনদিন যদি বৃষ্টি না থাকে তবে কৃষকেরা আশংকামুক্ত থাকবে। ঘরে ধান তুলতে পারবে।
জেলা প্রশাসক মিজ্ সোহানা নাসরিন বলেন, হাওর অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে কথাও বলেছি। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।